ইতিহাস
দিনাজপুর সরকারি কলেজ বাংলাদেশের উত্তর জনপদের একটি প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভূতাত্বিক সময় তালিকা অনুযায়ী “প্লায়োস্টোসিন পিরিয়ড” এ সৃষ্ট এ বরেন্দ্র ভূমির বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার যে কলেজটি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটিই বর্তমানের দিনাজপুর সরকারি কলেজ।

একে বেঁকে চলা পুনর্ভবা নদীর পূর্বতীরে দিনাজপুর শহরের উত্তর প্রান্তে কোলাহলমুক্ত সুইহারী এলাকার এক মনোরম পরিবেশে এই কলেজের অবস্থান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) কলকাতা কেন্দ্রিক নামি-দামি এবং বড় বড় কলেজগুলোর শাখা বাংলার অন্যান্য জেলায় স্থাপনের একটি উদ্যোগ ও কর্মপ্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪১ সালে কলকাতা রিপন কলেজ কর্তৃপক্ষ বাংলার যে কোন জেলায় একটি শাখা কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
সে সময় কলকাতা রিপন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গা পাহাড়পুর এলাকার কৃতীসন্তান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যানুরাগী রবীন্দ্র নারায়ন ঘোষ। কলেজ কর্তৃপক্ষ পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শাখা কলেজটি স্থাপনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারায় অধ্যক্ষ রবীন্দ্র নারায়ণ ঘোষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করে।
১৯৪১ সালে পুজার ছুটিতে দিনাজপুরে বেড়াতে এসে তিনি রিপন শাখা কলেজ স্থাপনের কর্মপ্রক্রিয়া শুরু করেন। এ জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন যার সদ্যসরা হলেন- মহারাজা জগদীশ নাথ রায় বাহাদুর, রায়বাহাদুর

শরবিন্দু রায়, চন্দ্রকান্ত দাস, খান বাহাদুর একিন উদ্দিন, মীর্জা কাদের বক্স, হাসনে আলী, যতীন্দ্র মোহন সেন, খান বাহাদুর সৈয়দ তোজাম্মেল আলী, মওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী, দূর্গামোহন রায় প্রমুখ।
১৯৪২ সালের ১ জুলাই শাখা রিপন কলেজের কার্যক্রম শুরু হয় মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুল ভবনে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৩ সালে। মর্নিং শিফ্টে পাঠদানের মাধ্যমে। তিনটি অনুষদে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৫০-১৭৫ জন। প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ক্ষিতীশ চন্দ্র ব্যাণার্জী। শিক্ষকদের অধিকাংশই আসেন কলকাতা থেকে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলেন জনাব হাসমতুল্লাহ্, এস. গাংগুলী, অমরেন্দ্র কুমার ঠাকুর এবং দর্শনের গোবিন্দ চন্দ্র দেব প্রমুখ।
১৯৪৫-৪৬ সালের দিকে মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুল হতে বাংলা স্কুলের সন্নিকটে মুসলিম হোস্টেল ভবনে কলেজটি স্থানান্তর হয়। উক্ত হোস্টেলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাংলা স্কুলে সকালের শিফ্টে ক্লাস অনুষ্ঠিত হত। দেশ বিভাগের পর সমস্যা দাঁড়ায় রিপন কলেজের শাখা হিসেবে একে টিকিয়ে রাখা। কারণ সে সময় ২/১ জন শিক্ষক ব্যতীত অধিকাংশই কলকাতায় চলে যান।
দেশ বিভাগের পরপরই ১৯৪৮ সালে ‘রিপন কলেজ’ শাখাটি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ (এস.এন. কলেজ) নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশেষভাবে খ্যাতিলাভ করে। বর্তমান মুন্সীপাড়া এলাকায় সদর হাসপাতাল সংলগ্ন “মুসলিম হোস্টেল ভবনে” অস্থায়ীভাবে কলেজের ক্লাসসমূহ শুরু হয় (যা বর্তমানে কলেজের “উচ্চমাধ্যমিক শাখা” হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে)।
১৯৫৩ সালে দিনাজপুর শহরের নিমনগর বালুবাড়ি এলাকায় ১৩ একর জমির উপর কলেজের নিজস্ব ভবন নির্মিত হয় এবং সেখানে কলেজটি স্থানান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব (জি.সি.দেব) ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ।
১৯৬৬-১৯৬৭ শিক্ষাবর্ষে সুরেন্দ্রনাথ কলেজটি (যা বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজ) নিমনগর বালুবাড়ি হতে শহরের উত্তরে সুইহারী এলাকায় প্রায় ৬৫ একর জমি সংবলিত বিস্তৃত এলাকায় নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয় এবং কলেজটি দিনাজপুর ডিগ্রি কলেজ নামে পরিচিত হয়। ১৫ই এপ্রিল, ১৯৬৮ সালে প্রাদেশিকীকরণ করার ফলে কলেজটি ‘দিনাজপুর সরকারি কলেজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
বিভাগপূর্ব আমলে অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার এই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ছিল অত্র অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার একমাত্র লালনক্ষেত্র। বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজ বিষয়/কোর্স, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, আয়তন ইত্যাদি বিচারে বৃহত্তর দিনাজপুরের সর্ববৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমান কলেজ ক্যাম্পাস ৩টি এলাকায় বিন্যস্ত। সুইহারীতে মূল কলেজ ক্যাম্পাস, মুন্সিপাড়া এলাকায় উচ্চ মাধ্যমিক শাখা এবং নিমনগর বালুবাড়ি এলাকায় অধ্যক্ষের বাসভবন অবস্থিত।
প্রথমে এই কলেজের যাত্রা শুরু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। পরবর্তীকালে এটি ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। উচ্চ মাধ্যমিক শাখাও একইভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বোর্ড, রাজশাহী বোর্ড এবং বর্তমানে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধিভুক্ত রয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই কলেজে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কলা-এই তিনটি অনুষদেই উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষাদান ব্যবস্থা চালু ছিল। ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে এখানে ৫টি বিষয়ে (পদার্থবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, গণিত, অর্থনীতি ও বাংলা) অনার্স কোর্স চালু করা হয়। ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষে ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও উদ্ভিদবিদ্যা এই সাতটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়।

১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষে আরও তিনটি বিষয়ে (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, দর্শন এবং রসায়ন) অনার্স কোর্স চালু হয়। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক (পাস) পর্যায়ে নিয়মিত পাঠদানসহ স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ১৫টি, স্নাতকোত্তর প্রথম পর্বে ১৪টি এবং স্নাতকোত্তর শেষ পর্বে ১৫টি বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১৮ হাজারের মত। শিক্ষকদের পদসংখ্যা ১৫১টি এবং কর্মচারীর সংখ্যা ১৫০ জন।
যে সকল চিরস্মরণীয় শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি দিনাজপুর সরকারি কলেজের প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তোরোত্তর সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখেন তাঁরা হলেন:
(১) জনাব খান বাহাদুর একিমুদ্দীন
(২) জনাব খান বাহাদুর মাহাতাবুদ্দীন
(৩) জনাব তফিরুদ্দীন
(৪) জনাব কাদের বক্স
(৫) জনাব আব্দুল্লাহ হিল বাকী
(৬) জনাব হাসান আলী
(৭) জনাব পানাউল্লাহ
(৮) জনাব হাসানুজ্জামান
(৯) ডা. হাফিজউদ্দীন আহ্মেদ
(১০) জনাব হাফিজউদ্দীন চৌধুরী
(১১) জনাব খান সাহেব সৈয়দ তোজাম্মুল আলী
(১২) মি. চন্দ্রকান্ত দাস এবং
(১৩) কলকাতাস্থ রিপন কলেজের অধ্যক্ষ জনাব রবীন্দ্র নারায়ণ ঘোষ প্রমুখ।